Home বিবিধ কৃষি কাজ ও কৃষকের অলক্ষে মূলধন হ্রাস
বিবিধ

কৃষি কাজ ও কৃষকের অলক্ষে মূলধন হ্রাস

Share
Share
কোনো নতুন ব্যবসায়ী যদি নিউমার্কেটে বা অন্য কোনো জায়গায় একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতে মনঃস্থির করেন, তাহলে তিনি এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কী কী বিষয় আমলে নিবেন? দোকান ভাড়া নেওয়া বাবদ অগ্রিম পরিশোধিত অর্থ, মাসিক দোকান ভাড়া, দোকান সজ্জা বাবদ ব্যয়, দোকানে মালপত্র উঠানো বাবদ খরচ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল, কর্মচারীদের বেতন, উৎসব ভাতা, প্রণোদনা ভাতা, সমিতির চাঁদা, লাইসেন্স নবায়ন ফি এবং সবশেষে তার নিজের শ্রমের মজুরি—সব বিষয় নিশ্চয়ই  বিবেচনা করবেন। একজন উৎপাদনকারীর ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারেন তিনি শিল্পোৎপাদনকারী বা কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী।ব্যবসায়ী ও শিল্পোৎপাদনকারী বিষয়গুলো ভালোভাবে আমলে নিলেও, কৃষকের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় লক্ষ্যণীয়।
একজন শিল্পোৎপাদনকারী মোট বিনিয়োগের পরিমাণ বিবেচনা করে, ১০%-২০% বা তারও বেশি হারে লাভের হিসাব কষেন। অনুরূপভাবে, একজন ব্যবসায়ীও তাই করে থাকেন। কিন্ত শুধু কৃষকের বেলায় এর ব্যত্যয় ঘটে।
আমাদের দেশের বেশির ভাগ কৃষক নিরক্ষর ও দারিদ্র্যপীড়িত। ব্যবসায়ী বা শিল্পোৎপাদনকারীর ন্যায় সে হিসাব করতে পারে না, তার মোট বিনিয়োগ কত। কৃষক শুধু সার-বীজ বাবদ ব্যয়, সেচ ব্যয়, শস্য বপন ও কর্তন-মাড়াই বাবদ কৃষাণ খরচের হিসাব জানে। তার লাখেরাজ জমির দাম বিনিয়োগের হিসাব-খাতায় থাকে না। আবার তার নিজের শ্রমের কোন মজুরি নাই, নাই কোন বিশ্রাম-বিরতি ও নির্ধারিত কর্মঘণ্টা। কৃষকের কাজ শুরু হয় কাক ডাকা ভোর থেকে, আর চলে সন্ধ্যার ছায়া নামা অবধি, কখনো কখনো চলে রাত পর্যন্ত। কৃষকের কোনো সাপ্তাহিক বন্ধ নাই, মাসিক ছুটি নাই, নাই ৩৬৫ দিনে নৈমিত্তিক বা অর্জিত ছুটির হিসাব, নাই প্রণোদনা ভাতা, নাই পারফরমেন্স ভাতা, নাই বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সুযোগ, নাই কাজের বৈচিত্র্য, নাই হাউজ রেন্ট, নাই মেডিকেল ভাতা। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান কোনো কিছুই তার কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। অন্যের আহারের সংস্থান করতে তিনি ছুটে চলেন নিরন্তর। অথচ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অন্ন আর আনন্দ তার থাকে না।
ঝুঁকির দিকটি যদি বিবেচনা করা হয়, দেখা যায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতে যেসব পেশাজীবী নিয়োজিত আছেন, সবাই কম-বেশি নামে-বেনামে ঝুঁকি ভাতা পেয়ে থাকেন। অনুরূপভাবে, একজন ব্যবসায়ী কিংবা শিল্পোৎপাদনকারীরও থাকে ঝুঁকির যথাযথ হিসাব। কিন্ত শুধু কৃষকের থাকে না কোনো ঝুঁকির হিসাব-নিকাশ। খরা, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসে ফসল বিপন্ন হলে, একজন কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়। সে আর  ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। নতুন করে ফসল ফলাতে সে পায় না কোন সরকারি-বেসরকারি সহায়তা। ব্যাংকগুলো দেয় না সহজ শর্তে ঋণ। ফলে কৃষককে শরণাপন্ন হতে হয় মহাজন নামক শোষকের, যার নিকট থেকে তারা অপেক্ষাকৃত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে থাকে। সুদে-মূলে মিলে টাকার অঙ্ক ফি বছর বাড়তেই থাকে। কৃষক উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে সুদের টাকা শোধ করলেও মূল টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে এক সময় হাত ছাড়া হয় তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনটিও।
যে মানুষটি তার বিনিয়োগের হিসাবই জানে না, সে লাভের হিসাব কষবে কী করে? স্বীয় শ্রমের মজুরি এবং জমির মূল্যসমেত চাষাবাদের অন্যান্য খরচ হিসাব করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি প্রতিনিয়ত একজন কৃষক তার অলক্ষে কী পরিমাণ মূলধন হারাচ্ছে।
মনে করা যাক, প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী একজন কৃষকের একমণ ধানের উৎপাদন খরচ ৭০০ টাকা। এখন, তিনি প্রতি মণ ধান ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি করলে  আপাতদৃষ্টিতে তার মণ প্রতি ৫০ টাকা লাভ হয়। কিন্ত তার নিজের শ্রমের মজুরি ও জমির মূল্য সহযোগে যদি খরচ হিসাব করা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই লাভ তো দূরের কথা, অনেক গুণ লোকসান হওয়ার কথা। এভাবে, কৃষক প্রতিনিয়ত তার অলক্ষে মূলধন হারায়। বিষয়টি নিয়ে কোনো বাস্তব ভিত্তিক গবেষণা না হলে, শিগগিরই বিশ্বস্ত ও বিশদ গবেষণা হওয়া দরকার।
মূলধন হারানোর আরো একটি বড় কারণ হলো মূল্য নির্ধারণে কৃষকের কোনো ভূমিকা না থাকা। কৃষক প্রায়শ ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না। প্রথমত, ব্যবসায়ী ও শিল্পোৎপাদনকারীর মতো কৃষকদের শক্তিশালী কোনো জোট না থাকায়, তারা কৃষিপণ্যর দাম নির্ধারণে দরকষাকষি করতে পারে না। ফলে বেশির ভাগ সময় তারা উৎপাদিত ফসল কম দামে বিক্রি করে থাকে। দ্বিতীয়ত, ফসল কাটার মৌসুমে সাধারণত ফসলের জোগান বেড়ে যাওয়ায় ফসলের দাম কম থাকে। একদিকে ফসল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকা, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের তাগাদাসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানোর ঝক্কি-ঝামেলায় তারা নিকটস্থ বাজারে ন্যায্য মূল্যর চেয়ে অনেক কমে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে কৃষকরা সাধারণত ফড়িয়া ও আড়তদারের নিকট ফসল বিক্রি করে থাকে। নিকটস্থ বাজারে সরাসরি বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত দামের তুলনায় ফড়িয়া ও আড়তদারের কল্যাণে হয়তো ৩%-৫% বেশি দাম কৃষক পেয়ে থাকে; কিন্ত বৃহৎ বাজারে প্রবেশের প্রত্যক্ষ সুযোগ থাকলে কৃষক যে মূল্য পেত, তা ফড়িয়া ও আড়তদারের কাছে বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত মূল্যের তুলনায় অনেক কম।  উদাহরণস্বরূপ, পঞ্চগড়ের একজন কৃষক স্থানীয় বাজারে কোনো সবজি বিক্রি করে যে দাম পান, তার তুলনায় ৩%-৫% বেশি দাম তিনি পেতে পারেন সেই সবজি ফড়িয়া  ও আড়তদারের নিকট বিক্রি করে। কেননা এসব ফড়িয়া ও আড়তদার  অপেক্ষাকৃত বৃহৎ বাজারে (যেমন : ঢাকার বাজার) অনেক গুণ বেশি দামে ক্রয়কৃত সবজি বিক্রি করে থাকে। এ ক্ষেত্রে কৃষক যদি বৃহৎ বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেত, তাহলে সে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতো না। আবার বৃহৎ বাজারের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের মূল্যের তারতম্য সংক্রান্ত তথ্য প্রায়শ কৃষকের জানা থাকে না। ফলে তারা স্থানীয় বাজারের ফড়িয়া ও আড়তদারদের সাথে দরকষাকষি করতে পারে না। তাই বাজার সংক্রান্ত তথ্য কিভাবে সহজলভ্য করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। তবে আশার কথা হল, বর্তমানে মোবাইল ফোনের ব্যাপক বিস্তৃতি এ সমস্যার অনেকাংশে সমাধান করবে বলে মনে হয়।আবার সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা কৃষিভিত্তিক চেইন শপগুলো কৃষকের নিকট থেকে সরাসরি উৎপাদিত ফসল ক্রয় করছে। এর ফলে কৃষকেরা কিছুটা লাভবান হচ্ছে।তবে এসব কৃষি ভিত্তিক চেইন শপগুলোর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার যেমন দরকার, তেমনি দরকার এগুলোর যথাযথ মনিটরিং।
পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যেসব দেশ স্থানীয় পর্যায়ে সহজলভ্য সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাতে পেরেছে, তারা প্রভূত উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে পৃথক হওয়ার পরে সিঙ্গাপুর শুধু তাদের সমুদ্র বন্দর কাজে লাগিয়ে আজ অর্থনৈতিকভাবে বেশ এগিয়ে। আমরা চীনের কথা বলতে পারি, যারা কি না মানব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আজ বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তি। তারা একদিকে যেমন শ্রমঘন শিল্প স্থাপন করেছে, তেমনি কৃষিতে ঘটিয়েছে বিপ্লব। আজ তারা কমপক্ষে ১০ টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
নদীবিধৌত বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় সুদূর অতীতকাল থেকেই এ দেশের অর্থনীতি কৃষি প্রধান। বর্তমানে আমাদের রয়েছে ১৬ কোটি মুখ। এত মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে অবশ্যই আমাদের কৃষির ওপর বাড়তি নজর দিতে হবে। বিগত বছরগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প খাতে যথেষ্ট উন্নতি হলেও এ দেশের ৭০ ভাগের বেশি মানুষ  এখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষক বাঁচলে, বাঁচবে দেশ। সাবাস কৃষক সমাজ, সাবাস বাংলাদেশ।
Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

A CURIOUS LOOK INTO CHAKMA LITERATURE

Bangladesh is predominantly a monolingual country with the exceptions to its local...

Emergence of a Nuru Peer

Nurul Islam was a day labourer. The people of Satani village pejoratively...

Adjectival phrase/Adjective phrase (AP)

Adjectival phrase/Adjective phrase (AP) অন্যান্য phrase এর ন্যায় Adjectival phrase/Adjective phrase (AP)...

অফিসকক্ষে ভৌতিক সন্ধ্যা

বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে অফিসের সবাই যখন পাঁচ তারকা হোটেলে আমোদ-ফুর্তিতে মাতোয়ারা, আমি...